মোহাম্মদ তারেক, চট্টগ্রাম : নগরের ফুটপাত পথচারীদের জন্য এবং সড়ক যানবাহন চলাচলের জন্য নির্ধারিত হলেও চট্টগ্রাম নগরের নিউ মার্কেট–রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় সেই নিয়ম অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। ফুটপাত দখল করে বসেছে চোরাই মোবাইল ফোন, ব্যাগ, ঘড়ি, স্মার্টওয়াচসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের অস্থায়ী দোকান।
অন্যদিকে সড়কের একাংশ দখল করে চলছে জুতা ও পোশাকের ব্যবসা। ফলে দিনের বেলায় তীব্র যানজট এবং সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বিশৃঙ্খল অবৈধ বাজারে। পথচারীরা বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে চলাচল করেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এলাকাটি চোরা মার্কেট নামে পরিচিত। রেলস্টেশনের প্রধান ফটক, নতুন ও পুরাতন মার্কেটের মধ্যবর্তী এলাকা এবং সংলগ্ন সড়কে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকানি বসেন। ছোট কাঠের টেবিল, প্লাস্টিকের বাক্স কিংবা অস্থায়ী ছাউনিতে সাজিয়ে রাখা হয় বিভিন্ন পণ্য। অনেক বিক্রেতা আগাম টাকা নিয়ে কম দামে ভালো মোবাইল এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পণ্যের উৎস সম্পর্কে কোনো সদুত্তর দিতে পারেন না।
দিনের বেলায় যাত্রী, শ্রমিক ও ক্রেতাদের ভিড়ে এলাকা মুখর থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্য পাল্টে যায়। নামিদামি ব্র্যান্ডের জুতা, ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ব্যাগ, স্মার্টওয়াচ, ল্যাপটপসহ নানা পণ্যের বেচাকেনা চলে প্রকাশ্যে। বাজারদরের তুলনায় কম দামের কারণে অনেকেই পণ্যের উৎস সম্পর্কে সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও কেনাকাটা করেন।
[caption id="attachment_1762" align="alignnone" width="300"]
চোরা মোবাইল বিক্রি[/caption]
সরেজমিনে দেখা গেছে, আগে বড় ট্রাংকে পণ্য নিয়ে বসা বিক্রেতারা এখন ছোট কাঠের টেবিল ব্যবহার করছেন। এতে অভিযান পরিচালিত হলে মুহূর্তেই পণ্য সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা বলেন, অভিযান এলে ফোন-ঘড়ি পকেটে ঢুকিয়ে দিলেই হয়। কয়েক মিনিট পর আবার ব্যবসা শুরু করি।”
চোরাই পণ্য বিক্রির অভিযোগ শুধু গুঞ্জনেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয়দের দাবি, পাথরঘাটার একটি মসজিদ থেকে চুরি হওয়া একটি দামি জুতা দুই দিন পর এই ফুটপাতের একটি দোকানে পাওয়া যায়। ভুক্তভোগী তোহিদ জানান, প্রায় দুই হাজার টাকা মূল্যের জুতা ফিরে পেতে তাঁকে ৯০০ টাকা দিতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, কোনো কিছু চুরি হলে আগে এই বাজারেই খুঁজতে হয়।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর কয়েকজন ফেরিওয়ালার পুরোনো কাপড় বিক্রির মাধ্যমে এই বাজারের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ঘড়ি, ব্যাগ, মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক পণ্য যুক্ত হতে থাকে। ১৯৭০-এর দশকে যেখানে দোকান ছিল মাত্র পাঁচ-ছয়টি, বর্তমানে সেই সংখ্যা তিন শতাধিক। পুরাতন রেলস্টেশন, বাস কাউন্টার এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় চুরি ও পকেটমার চক্রের জন্য এটি নিরাপদ বিপণনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিভিন্ন স্থান থেকে চুরি হওয়া মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রও এখানে সক্রিয়। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের চোখের সামনেই এসব কর্মকাণ্ড চললেও পুরো সিন্ডিকেট বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি মহল এই অবৈধ বাজারকে টিকিয়ে রাখতে নেপথ্যে ভূমিকা রাখছে। দোকানভেদে দৈনিক কিংবা মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায়ের কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। যদিও এসব অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে।
এদিকে প্রশ্ন উঠেছে, অবৈধ এসব দোকানে কীভাবে নিয়মিত বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং কারা এর পেছনে রয়েছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ যানজটে ভোগান্তির শিকার হলেও ফুটপাত দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না। আশপাশে বিপুল জনসমাগম থাকায় চোরচক্র সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যায়, ফলে তাদের শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
কোতোয়ালি থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, এই এলাকায় চোরাই পণ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অবৈধ দোকান বা চোরাই পণ্যের বেচাকেনা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে চোরাই পণ্য সংগ্রহ ও বিপণন একটি প্রযুক্তিনির্ভর এবং সংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় ‘ফিল্ড টিম’ সুযোগ বুঝে মোবাইল ফোন, ব্যাগ, ল্যাপটপ, ঘড়ি এমনকি মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ চুরি করে। পরে এসব পণ্য মধ্যস্থতাকারীদের কাছে কম দামে বিক্রি করা হয়। সেখান থেকে গোপন গুদাম বা অস্থায়ী আস্তানায় নিয়ে বাছাই করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে ফুটপাতের দোকানে পৌঁছে দেওয়া হয়। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে এই চোরাই পণ্যের সিন্ডিকেট।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আলী রাশেদ, চেয়ারম্যান : নিশিতা বড়ুয়া, পরিচালক : মুমতাহিনা মুমু
নিউজ নিমুরা প্রধান কার্যলয় : ফজল ভিলা, ৭৪৫/এ, শহীদ মির্জা লেইন, মেহদীবাগ, চট্টগ্রাম। মোবাইল : ০১৭৯৫৯৯৯১০৭
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত